বাঙালির খাদ্যতালিকায় মাছ-ভাত প্রধান হলেও শরীরের প্রয়োজনীয় প্রোটিন, আয়রন ও ভিটামিনের অন্যতম প্রধান উৎস হলো লাল মাংস। কিন্তু সাতক্ষীরার উপকূলীয় ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের নিম্নবিত্ত ও দিনমজুর পরিবারের সাধারণ মানুষের কাছে মাংস খাওয়া এখন ‘বিলাসিতা’। নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতি আর একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগে পড়ে সব হারিয়ে বছরে শুধু কোরবানির সময়ই তারা মাংসের মুখ দেখেন।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ইইঝ) সর্বশেষ ‘জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২’-এর সাতক্ষীরা জেলা ও কমিউনিটি রিপোর্টে এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক অনগ্রসরতার এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে ওঠে। শুমারি অনুযায়ী, শ্যামনগর উপজেলার মোট জনসংখ্যার একটি বিশাল অংশ এখনো চরম দারিদ্র্য সীমায় বাস করছে। বিশেষ করে উপকূলীয় গাবুরা ইউনিয়নে মোট ১৫ হাজার ১৫৫ টি পরিবারের মধ্যে মাত্র ১ হাজার ২৯০ টি পরিবার পাকা বা আধা-পাকা ঘরে এবং বাকি প্রায় ৯১.৪৮ শতাংশ পরিবারই বাস করছে কাঁচা ঘর ও ঝুঁপড়িতে। চরম অর্থনৈতিক সংকটে থাকা বাসস্থানহীন এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর পক্ষে নিয়মিত বাজার থেকে মাংস কিনে খাওয়া একেবারেই অসম্ভব।
মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে জানা যায়, ঘূর্ণিঝড় আইলা, আম্ফান, ইয়াস, ফণী, বুলবুল কিংবা সাম্প্রতিক সময়ের ঘূর্ণিঝড় রিমাল ও নদীভাঙনের মতো একের পর এক দুর্যোগের কারণে উপকূলের মধ্যবিত্তরাও আজ নিঃস্ব হয়ে নিম্নবিত্তে পরিণত হয়েছেন। ফলে এই অঞ্চলে সামর্থ্যবানদের কোরবানি দেওয়ার হারও প্রায় ৩০ শতাংশ কমে গেছে।
গাবুরার ডুমুরিয়া এলাকার মিজানুর রহমান বলেন, “ঈদের দিন স্থানীয় ডুমুরিয়া তরফদার বাড়ি জামে মসজিদসহ বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, কোরবানি কমে যাওয়ায় দুস্থ পরিবারগুলোর ভাগ্যে মাথাপিছু মাত্র ২৩০ গ্রাম (৫ জনের পরিবারে এক কেজির সামান্য বেশি) করে মাংস জুটেছে। গত কোরবানির পর এবার ঈদে একটু মাংস চোখে দেখলাম, তা সংরক্ষণ করার মতো তো কিছু নেই-এমনটাই আক্ষেপ স্থানীয় প্রান্তিক মানুষদের।”
সাতক্ষীরা উপকূলের গাবুরা, বুড়িগোয়ালিনী ও শ্যামনগর এলাকা ঘুরে দেখা যায়, এখানকার সাধারণ মানুষের ডাল, আলু কিংবা সামান্য শুঁটকি-মাছ দিয়েই চলে অধিকাংশ বেলার আহার।
শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউয়নের ডুমুরিয়া এলাকার বাসিন্দা আমেনা খাতুন বলেন, “সংসার চালাতেই হিমশিম খেতে হয়, মাংস কিনবো কীভাবে?”
তিনি আরও বলেন, “আমার স্বামী সুন্দরবনে মধু আহরণ করতে গিয়ে বাঘের আক্রমণে প্রাণ হারায় এখান থেকে ২২ বছর আগে। সুন্দরবনের নদীতে মাছ ধরে, মানুষের বাড়িতে কাজ করে কোনো রকম সংসার চালাচ্ছি।
একই এলাকার দিনমজুর লিয়াকত আলী বলেন, “আগে সুন্দরবন থেকে যা আয় হতো, এখন তা-ও বন্ধের মুখে। মাংস খাওয়া তো স্বপ্নের মতো।”
স্থানীয়দের এই শারীরিক দুর্বলতার পেছনে রয়েছে কর্মসংস্থান ও আয়ের তীব্র সংকট। পরিসংখ্যান ব্যুরোর টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (ঝউএ) সূচক অনুযায়ী, শ্যামনগর ও গাবুরা অঞ্চলের ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সি যুবসমাজের এক বিরাট অংশ (বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে প্রায় ৬০% এর বেশি) কোনো প্রকার শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা কারিগরি প্রশিক্ষণের সাথে যুক্ত নেই। ঘরে ঘরে কর্মক্ষম মানুষের এই বেকারত্বই উপকূলের পরিবারগুলোকে পুষ্টিকর খাদ্য কেনা থেকে বঞ্চিত রাখছে।
উপকূলীয় ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের এই পুষ্টিহীনতা ও শারীরিক জটিলতার বিষয়ে জানতে চাইলে সাতক্ষীরা সদর উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. ফরহাদ জামিল বলেন, “শরীরে আয়রনের সবচেয়ে উৎকৃষ্ট ও প্রকৃষ্ট উৎস হলো গরুর মাংস এবং গরুর কলিজা। মুরগির মাংস কিন্তু ঐরকম আয়রনের উৎস নেই। আবার অনেকে মনে করেন কচু শাক বা লাল শাকে প্রচুর আয়রন, কিন্তু এগুলো আসলে দ্বিতীয় বা তৃতী সারির উৎস; গরুর মাংসের সমকক্ষ কখনোই নয়। ফলে দীর্ঘদিন যারা গরুর মাংস বা লাল মাংস খেতে পারছে না, তারা নিশ্চিতভাবেই মারাত্মক অপুষ্টিতে ভুগছে।”
তবে উপকূলের মানুষের পুষ্টির এই ঘাটতিকে সম্পূর্ণ ভিন্ন কোণ থেকে দেখছেন শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান। তাঁর মতে, “শুধু গরুর মাংস বা লাল মাংসের ওপরই পুষ্টির চাহিদা সম্পূর্ণ নির্ভর করে না।”
তিনি বলেন, “বছরে মানুষ একবার গরুর মাংস খাচ্ছে-এটি শুনতে হয়ত খারাপ শোনায়, কিন্তু আমিষ বা প্রোটিনের চাহিদা পূরণের জন্য কেবল গরুর মাংসই লাগবে এমন কোনো কথা নেই।”
সাউদান চ্যারিটি যুব ফাউন্ডেশনের সভাপতি আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, “গাবুরা এবং পাতাখালি অঞ্চলের মানুষের মাঝে পুষ্টিহীনতার সমস্যাটি অত্যন্ত প্রকট এবং দিন দিন এটি বেড়েই চলেছে। নদী উপকূলীয় এলাকা হওয়ার কারণে এ অঞ্চলের মানুষ নদী থেকে কম-বেশি মাছ পায়, যার ফলে তাদের আমিষের ঘাটতি কিছুটা হলেও পূরণ হয়।”
এ বিষয়ে গাবুরা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মাসুদুল আলম বলেন, “আমাদের এলাকা দুর্যোগপ্রবণ। এ অঞ্চলে একদিকে তীব্র লবণাক্ততা এবং অন্যদিকে অনাবৃষ্টি বা খরা বিরাজ করছে। এখানকার পুরো পরিবেশটাই লবণাক্ত, যার ফলে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার মান অত্যন্ত নিম্নমুখী। এই প্রতিকূল পরিবেশের কারণে স্থানীয় জনগণের স্বাস্থ্যগত অবস্থা খুবই নাজুক।”
সরকারিভাবে যদি পুষ্টি কার্ড বা দুস্থদের জন্য বিশেষ পুষ্টিকর খাদ্য সহায়তার ব্যবস্থা করা যেত, তবে এই অঞ্চলের মানুষের শারীরিক সক্ষমতা রক্ষা করা সম্ভব হতো।
খুলনা গেজেট/এনএম

